ইউরোপের শ্রমবাজারে এখন অভাব দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীর। করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপের অনেক দেশেই শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে জার্মানি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, হাঙ্গেরি, মাল্টা, ফিনল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও এস্তোনিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এশিয়ার দেশগুলো থেকে শ্রমিক নিচ্ছে — যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে অনেকেই ইউরোপে কাজের আশায় যাচ্ছেন, তবে সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ছেন। তাই এখনকার প্রক্রিয়াটা কেমন, কোন পথে যাওয়া নিরাপদ, আর কোন কাজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি — সেই নিয়েই এই প্রতিবেদন।
ইউরোপে কাজের চাহিদা এখন কোথায়
বর্তমানে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক দরকার নির্মাণ, কৃষি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, স্বাস্থ্যসেবা, গাড়ি চালনা, গুদাম ও আইটি সেক্টরে। জার্মানি ও ফিনল্যান্ডে বিশেষ করে নার্স, বৃদ্ধসেবা কর্মী এবং টেকনিশিয়ানদের জন্য প্রচুর সুযোগ রয়েছে। মাল্টা, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরিতে গার্মেন্টস, ফুড প্রোসেসিং ও কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মীরা ভালো অবস্থানে আছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত সদস্য দেশগুলোতে প্রায় ১ কোটি নতুন শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। অনেক দেশ তাই তৃতীয় বিশ্বের দক্ষ কর্মীদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট কোটা বাড়িয়েছে।
ওয়ার্ক পারমিটে যেতে কী কী লাগে
ইউরোপে বৈধভাবে কাজ করতে হলে প্রথমেই দরকার সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়োগদাতার কাছ থেকে “Job Offer Letter” বা “Employment Contract”। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আপনাকে কাজের জন্য নিয়োগ দিতে রাজি হয়, তাহলেই আপনি ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করতে পারবেন।
সাধারণত যে কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন হয়:
- বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাসের মেয়াদ থাকতে হবে)
- চাকরির আমন্ত্রণপত্র বা চুক্তিপত্র
- শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রমাণ
- মেডিকেল সনদ
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট
- ভিসা ফি এবং ফটো
চুক্তিপত্র অনুযায়ী নিয়োগকর্তা যদি আবাসন, বিমা বা ট্রাভেল খরচ বহন করে, তাহলে সেটি আবেদনপত্রে উল্লেখ করতে হয়। ভিসা অনুমোদন পেলে সেই দেশের দূতাবাস থেকে ওয়ার্ক ভিসা ইস্যু করা হয়।
কোন কোন দেশে বাংলাদেশিদের সুযোগ বেশি
মাল্টা: ইউরোপের ছোট দেশ হলেও এখানে গার্মেন্টস, কনস্ট্রাকশন ও হসপিটালিটি খাতে বাংলাদেশিদের চাহিদা বাড়ছে। মাল্টার সরকার বৈধ পথে বিদেশি কর্মী আনার নীতি সহজ করেছে।
পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি: এ দুই দেশে নির্মাণ, কৃষি ও গুদাম কর্মী হিসেবে প্রচুর বাংলাদেশি কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ভিসা প্রসেসিং ও থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।
পর্তুগাল: পর্তুগালে “Regularization” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধভাবে কাজ করা সম্ভব। যারা বৈধ কনট্রাক্ট ও ট্যাক্স রিটার্ন দেখাতে পারেন, তারা পরবর্তীতে রেসিডেন্স পারমিটও পান।
জার্মানি ও ফিনল্যান্ড: উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীদের জন্য “EU Blue Card” প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। এতে তথ্যপ্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, স্বাস্থ্যসেবা ও টেকনিক্যাল সেক্টরের পেশাজীবীরা দ্রুত ওয়ার্ক পারমিট পান।
প্রতারণা থেকে সাবধান
দালাল বা ভুয়া এজেন্সির মাধ্যমে ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেকেই “ওয়ার্ক পারমিট” বা “অফার লেটার” দেখিয়ে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অথচ ইউরোপীয় দূতাবাস সরাসরি অনুমোদিত নিয়োগপত্র ছাড়া কোনো ভিসা দেয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেউ যদি ইউরোপে কাজের অফার পায়, তাহলে সেটি অবশ্যই যাচাই করতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম মন্ত্রণালয় বা দূতাবাসের ওয়েবসাইটে। অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি বা সরাসরি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিই নিরাপদ উপায়।
সরকারের উদ্যোগ
বাংলাদেশ সরকার এখন ইউরোপের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরির সঙ্গে শ্রমিক পাঠানো নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন টেকনিক্যাল ট্রেনিং প্রোগ্রামও চলছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে “Safe Migration” কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যাতে কর্মীরা বৈধ পথে বিদেশে যেতে পারেন।
উপসংহার
ইউরোপে বৈধ ওয়ার্ক পারমিটে যাওয়া এখন আগের চেয়ে সহজ, তবে প্রতারণা ও ভুল তথ্যের ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে। সঠিক যোগ্যতা, ভাষা দক্ষতা এবং বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে ইউরোপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চাকরির অফার নিশ্চিত হলে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে সরকারি বা অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে—ইউরোপে যাওয়ার কোনো শর্টকাট পথ নেই, কিন্তু বৈধ পথেই রয়েছে টেকসই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
